আমাদেরবাংলাদেশ ডেস্ক।। ঢাকাই চলচ্চিত্রের আলোচিত নায়িকা পরীমনি গত ৪ আগস্ট রাতে তার রাজধানীর বনানীর বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছেন। সঙ্গে তার সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপু এবং প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজও গ্রেফতার হয়েছেন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পরীমনি এখন রিমান্ডে রয়েছেন। মামলার তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ নায়িকাকে জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পরীমনি জানিয়েছেন, গত জুনে ঢাকার সাভারের বোটক্লাবে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অভিযোগ করার পর যে মামলা হয়েছিল, সেটির তদন্তকালে তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গেছেন তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন শিথিল। বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর পুলিশে তোলপাড় চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,বোট ক্লাবের ১৩ জুনের ঘটনার পর পরীমনি তাকে ধর্ষণচেষ্টা ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে অভিযোগ আনলে মামলা হয়। মামলার পরদিনই আসামি হিসেবে ক্লাব নেতা ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদকে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার সঙ্গে গ্রেফতার হন আরও কয়েকজন সহযোগী।
মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীমনিকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। তখনই ডিবির গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ- কমিশনার (এডিসি) গোলাম সাকলায়েন শিথিলের সঙ্গে পরিচয় হয় পরীমনির। এরপর দুজনের মধ্যে শুরু হয় যোগাযোগ। নিয়মিত পরীমনির বাসায় যাতায়াত শুরু করেন গোলাম সাকলায়েন শিথিল। মাঝে-মধ্যেই গাড়ি নিয়ে বের হতেন দু’জনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, সবশেষ পরীমনি পুলিশ কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন শিথিলের রাজারবাগের মধুমতি ভবনের বাসায় গিয়ে প্রায় ১৮ ঘণ্টা অবস্থান করেন। ৪ আগস্ট রাতে গ্রেফতারের পর পরীমনি অকপটে স্বীকার করেছেন সবকিছু।
তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, পরীমনিকে গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দা কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন শিথিলের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ফাঁস হয়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত রাজারবাগের মধুমতি বাসভবনের কেয়ারটেকার শামীমকে সিসিটিভি ফুটেজের ডিভিআরসহ পুলিশ সদরদফতরে ডেকে পাঠান। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পরীমনির বক্তব্যের সত্যতা পান।
সংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা সিসিটিভির ফুটেজের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, ১ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে পরীমনির সাদা রংয়ের একটি হ্যারিয়ার গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৫৯৬৫৩) গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের ওই আবাসিক ভবনের সামনে থামে। প্রথম সেই গাড়ি থেকে লাল রংয়ের টি-শার্ট পরিহিত গোলাম সাকলায়েন শিথিল নামেন। এরপর সাদা রংয়ের একটি স্লিপিং গাউন পরিহিত অবস্থায় নামেন হালের আলোচিত নায়িকা পরীমনি। এসময় তার কোলে ছিল বাদামি রংয়ের কুকুর, যাকে পরীমনি ‘কুটু’ বলে ডাকেন।
এরপর রাত দেড়টায় ওই ভবনের সামনে আবার আসে পরীমনির গাড়ি। শিথিলের পরিচয় দিয়ে সেখানে ঢোকেন চালক। গাড়ি পার্কিং করে তিনি মোবাইলে উচ্চশব্দে গান ছেড়ে শুনছিলেন। এতে সন্দেহ হয় দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীর। কারণ পুলিশের নিজস্ব কোনো চালক এতো রাতে আবাসিক এলাকার মধ্যে এভাবে গান শোনার কথা নয়।
তিনি তখন পরীমনির ওই চালকের কাছে তার পরিচয় ফের জানতে চান। চালক তখন ওই নিরাপত্তাকর্মীকে জানান, পরীমনির সঙ্গে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিয়ে হয়েছে বলে তিনি জানেন।
৪ আগস্ট রাতে পরীমনির সঙ্গে হেফাজতে নেয়া গাড়িচালক মো. নাজির হোসেনও জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ওই দিন সকাল ৭টার দিকে পরীমনির ফোন পেয়ে তিনি বনানীর বাসায় যান। সেই বাসা থেকে একসঙ্গে গোয়েন্দা কর্মকর্তা সাকলায়েন ও পরীমনি হ্যারিয়ার গাড়িতে ওঠেন। এরপর তিনি তাদের ওই পুলিশ কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনে নামিয়ে চলে যান। আবার রাতে ফোন পেয়ে সেই ভবনের সামনে যান। তখন তাকে নিরাপত্তাকর্মীরা নানা প্রশ্ন করেছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে পরীমনি জানিয়েছেন, নিয়মিত কথা বলতে বলতে ডিবি কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন শিথিলের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। এরপর তারা নিয়মিত গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হতেন। গোলাম সাকলায়েন শিথিল তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সর্বশেষ তিনি গত ১ আগস্ট গোলাম সাকলায়েন শিথিলের সরকারি বাসভবন রাজারবাগের মধুমতির ফ্ল্যাটে যান।
পরীমনির সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপু জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ঈদুল আজহার পর তিনি পরীমনির বাসায় গিয়ে জানতে পারেন গোলাম সাকলায়েন শিথিল এসে তার বাসায় তিন দিন ছিলেন। তিনি শিথিলের সঙ্গে পরীমনির প্রেমের সম্পর্কের কথা জানতেন। পরীমনিই তাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে শিথিল নিজেকে অবিবাহিত বলে দাবি করেন। কিন্তু পরে শিথিল বিবাহিত জানতে পারলে পরীমনি ক্ষুব্ধ হন।
বিষয়টি নিয়ে পুলিশে তোলপাড় হলেও শুক্রবার (৬ আগস্ট) রাত পর্যন্ত গোলাম সাকলায়েন শিথিলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) গোলাম সাকলায়েন শিথিল বলেন, ‘পরীমনির সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে। তবে তা প্রেমের সম্পর্ক নয় এবং আমরা বিয়েও করিনি।’
গত ১ আগস্ট পরীমনিকে তার মধুমতির বাসভবনে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন ডিবির এই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটি যদি অনৈতিক কাজ হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত করে তার (গোলাম সাকলায়েন শিথিল) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এদিকে নায়িকা পরীমনির সঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন শিথিলের ‘অনৈতিক সম্পর্কের’ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
শনিবার (৭ আগস্ট) মালিবাগের সিআইডি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. ওমর ফারুক এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘৬ আগস্ট আমরা মামলার ডকেট বুঝে পেয়েছি, আসামির হেফাজতও বুঝে পেয়েছি। আসামিদের মধ্যে পরীমনি, মডেল মৌ, পিয়াসা ও নজরুল ইসলাম রাজ বর্তমানে সিআইডির হেফাজতে রয়েছে। তবে হেলেনা জাহাঙ্গীর ও মিশু হাসান বর্তমানে আমাদের হেফাজতে নেই। তারা অন্য মামলার তদন্তে ডিএমপির হেফাজতে।’
পরীমনি এখন আসামি। তবে এর আগে অন্য একটা মামলায় তিনি বাদী ছিলেন। ঘটনাক্রমে একজন মামলার বাদীর সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগগুলো তদন্তে উঠে আসবে কি-না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, ‘অবশ্যই উঠে আসবে। আমরা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করব। সেই কারণে মামলা এবং আসামি সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যম ও গণমাধ্যমে যা প্রকাশ পাবে, সেই বিষয়গুলোও তদন্তের সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, ‘সবেমাত্র আমরা তদন্ত শুরু করেছি। সুতরাং এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষ থেকে বেশি কিছু বলা মুশকিল। সিআইডিতে যেকোনো তদন্তই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে করা হয়।’
‘আমাদের ফরেনসিক ল্যাব, কেমিক্যাল ল্যাব, ডিএনএ ল্যাব ও আইটি ফরেনসিক ল্যাব রয়েছে। আমরা মামলার তদন্ত সুষ্ঠুভাবে করতে চাই। এর জন্য তদন্ত কার্যক্রমে আমাদের সময় লাগবে। ইতোমধ্যে সিআইডির হেফাজতে থাকা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে’ যোগ করেন তিনি।
পরীমনির অপর্কমের অভিযোগগুলোর সঙ্গে প্রভাবশালীরাও জড়িত, এ প্রসঙ্গে শেখ ওমর ফারুক বলেন, ‘অবশ্যই, যদি প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকে। তবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারণ কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
আমাদেরবাংলাদেশ.কম/রাজু